বুধবার, নভেম্বর ৪, ২০২৬

ঘুমানোর আগে সুরা মুলক তিলাওয়াতের ফজিলত, কী বলেছে হাদিস

ফখরুল ইসলাম নোমানী

by Dainik Udayan
0 comments

পবিত্র কোরআনের ৩০ আয়াতের একটি সুরা পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করতে থাকবে, যতক্ষণ না তাঁকে ক্ষমা করা হয়। সুরাটি হলো সুরা মুলক। কোরআনের ২৯তম পারার প্রথম সুরা এটি। ক্রম অনুসারে কোরআনের ৬৭তম সুরা। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, কর্তৃত্ব ও মহত্ত্বের বর্ণনা দিয়ে শুরু হওয়া এ সুরায় আসমান, গ্রহ-নক্ষত্রের সৃষ্টি এবং সৃষ্টিজগতের নিপুণতার মধ্য দিয়ে আল্লাহর কুদরতের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

সুরা মুলকের ফজিলত সম্পর্কে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এসব বর্ণনায় সুরাটির সুপারিশ, ক্ষমা লাভ এবং কবরের আজাব থেকে সুরক্ষার কথা এসেছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, পবিত্র কোরআনে ৩০ আয়াতের একটি সুরা রয়েছে, যা পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করতে থাকবে, যতক্ষণ না তাকে ক্ষমা করা হয়। সুরাটি হলো ‘তাবারাকাল্লাজি বিইয়াদিহিল মুলক’, অর্থাৎ সুরা মুলক।

হাদিসে আরও বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতে সুরা মুলক না পড়ে ঘুমাতেন না। অন্য একটি বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি সুরা আস-সাজদা ও সুরা মুলক তিলাওয়াত না করে ঘুমাতেন না। এ কারণে রাতে ঘুমানোর আগে সুরা মুলক পাঠ করাকে গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কবরের আজাব থেকে সুরক্ষার আমল

কবরের জীবন আখিরাতের প্রথম ধাপ। সেখানে মুক্তি লাভ করতে পারলে পরবর্তী ধাপগুলো সহজ হবে, আর সেখানে মুক্তি না পেলে পরবর্তী পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। হজরত উসমান (রা.) কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কাঁদতেন। তাঁর দাড়ি ও বুক অশ্রুতে ভিজে যেত। লোকজন তাঁকে জিজ্ঞাসা করতেন, জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা শুনেও তিনি এত কাঁদেন না, অথচ কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এত বেশি কাঁদেন কেন?

banner

জবাবে তিনি বলতেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে তিনি শুনেছেন, কবর আখিরাতের প্রথম ধাপ। যে ব্যক্তি সেখানে মুক্তি পাবে, তার জন্য পরবর্তী ধাপগুলো সহজ হবে। আর যে সেখানে মুক্তি পাবে না, তার জন্য পরবর্তী ধাপগুলো আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

সুরা মুলক পাঠের সঙ্গে কবরের আজাব থেকে সুরক্ষার বিষয়টিও হাদিসে এসেছে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, মৃত ব্যক্তির কাছে শাস্তি দেওয়ার জন্য ফেরেশতারা পায়ের দিক দিয়ে আসতে চাইলে পা বলবে, এদিক দিয়ে আসার পথ নেই, কারণ সে সুরা মুলক পাঠ করত। এরপর ফেরেশতারা বুক বা পেটের দিক দিয়ে আসতে চাইলে সেখান থেকেও বাধা দেওয়া হবে। বলা হবে, এদিক দিয়ে আসার পথ নেই, কারণ সে সুরা মুলক নিজের মধ্যে ধারণ করেছিল। মাথার দিক দিয়ে আসতে চাইলেও বাধা দেওয়া হবে, কারণ সে মাথা দিয়ে সুরাটি পাঠ করেছিল।

এই বর্ণনায় সুরা মুলককে কবরের আজাব থেকে বাধাদানকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, তাওরাতেও সুরাটির উল্লেখ ছিল। যে ব্যক্তি রাতে এটি পাঠ করে, সে উৎকৃষ্ট আমল করে।

যে সময়ে তিলাওয়াত করবেন

সুরা মুলক রাতের যেকোনো সময়ে পড়া যায়। বিশেষভাবে ঘুমানোর আগে এটি তিলাওয়াত করার কথা হাদিসে এসেছে। এশার নামাজের পর ঘুমানোর আগে সুরাটি পড়ার আমলও বর্ণিত হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে দিনের বেলায় সুরাটি পড়া যাবে না। পবিত্র অবস্থায় কোরআন তিলাওয়াতের নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। দিনের যেকোনো সময় সুরা মুলক পড়া যায়। তবে রাতে ঘুমানোর আগে পাঠ করাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সুরাটি নামাজের মধ্যে তিলাওয়াত করাও উত্তম। মুখস্থ না থাকলে দেখে দেখে অর্থ বুঝে পড়া যায়। সুরার নামের মধ্যেই এর মূল বক্তব্যের পরিচয় রয়েছে। আরবি ‘মুলক’ শব্দের অর্থ সার্বভৌমত্ব। আসমান ও জমিনের একচ্ছত্র সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক যে আল্লাহ, তা এ সুরায় স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

সুরাটির দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে মানুষকে পরীক্ষা করা যায়, তাদের মধ্যে কে আমলে উত্তম। তিনি পরাক্রমশালী ও ক্ষমাশীল। আয়াতটিতে জীবনের পাশাপাশি মৃত্যুকেও সৃষ্টির বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ মৃত্যু শুধু জীবনের অবসান নয়, এটি আল্লাহর সৃষ্টির একটি বিষয়। যিনি মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন, তিনি নিজে মৃত্যুর অধীন নন। জীবন ও মৃত্যুর সৃষ্টির উদ্দেশ্য বর্ণনার মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনের লক্ষ্যও তুলে ধরা হয়েছে।

কেয়ামতের দিন সুপারিশের আশা

সুরা মুলকের ফজিলত সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসগুলোতে কেয়ামতের দিন পাঠকারীর পক্ষে সুপারিশ করার কথা এসেছে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি বর্ণনায় সুরাটি নিজে পড়ার পাশাপাশি পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের শেখানোর কথা বলা হয়েছে। সেখানে সুরা মুলককে মুক্তিদানকারী ও বিরোধিতাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্ণনা অনুযায়ী, কেয়ামতের দিন সুরাটি আল্লাহর কাছে পাঠকারীর পক্ষে সুপারিশ করবে এবং তাকে জাহান্নামের আজাব ও কবরের আজাব থেকে রক্ষার কারণ হবে।

আরেকটি বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে সুরাটি উম্মতের অন্তরে গেঁথে থাকার আকাঙ্ক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বর্ণনা থেকে সুরাটি নিয়মিত তিলাওয়াত করা এবং এর শিক্ষা অনুধাবনের গুরুত্ব বোঝা যায়।

কবরের প্রশ্নের প্রস্তুতি

মৃত্যুর পর কবরের প্রশ্নোত্তর সম্পর্কে মুসলমানদের সচেতন থাকা প্রয়োজন। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, কবরে মুনকার ও নাকির ফেরেশতা তিনটি প্রশ্ন করবেন: তোমার রব কে, তোমার দ্বীন কী এবং তোমার নবী কে? একজন সত্যিকার মুমিন এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবেন। এ বিশ্বাস ও পরকালের জবাবদিহির ভয় মানুষকে ঈমান ও সৎকর্মের পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করে।

কবরের আজাব থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ার পাশাপাশি সুরা মুলক তিলাওয়াতের আমলও গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও কবরের আজাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়ায় বলতেন, হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে কবরের আজাব থেকে আশ্রয় চাই, জাহান্নামের শাস্তি থেকে আশ্রয় চাই এবং জীবন-মৃত্যু ও দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই।

কবরের আজাব থেকে মুক্তির জন্য বর্ণিত দোয়াটি হলো, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন আজাবি জাহান্নামা, ওয়া আউজুবিকা মিন আজাবিল কবরি, ওয়া আউজুবিকা মিন ফিতনাতিল মাসিহিদ দাজ্জালি, ওয়া আউজুবিকা মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাত।’

এর অর্থ, হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে জাহান্নামের আজাব থেকে আশ্রয় চাই, কবরের আজাব থেকে আশ্রয় চাই, মসিহ দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই এবং জীবন-মরণের বিপদাপদ থেকে আশ্রয় চাই।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের এ দোয়াটি এমনভাবে শেখাতেন, যেভাবে কোরআনের সুরা শেখাতেন।

আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) যেসব কাজে সন্তুষ্ট হন, সেসব কাজে বেশি বেশি আত্মনিয়োগ করা উচিত। সুরা মুলক নিয়মিত তিলাওয়াতের পাশাপাশি এর অর্থ ও শিক্ষা বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। সুরাটির নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করলে এর সুপারিশ, আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাত লাভের আশা করা যায়।

আল্লাহ আমাদের প্রতিদিন এশার নামাজের পর রাতে ঘুমানোর আগে সুরা মুলক তিলাওয়াত ও এর শিক্ষা বোঝার তৌফিক দিন। আমিন।

লেখক: ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট

You may also like

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
-
00:00
00:00
Update Required Flash plugin
-
00:00
00:00